সুপারবাগ: লন্ডনীদের এক নতুন শঙ্কা

স্টাফ রিপোর্ট :: ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরদের জন্য এবারে এক নতুন শঙ্কা হাজির। প্রবাসী বাংলাদেশিরা মারণঘাতী সুপারবাগ এমআরএসএ আক্রান্ত হওয়ার বেশি ঝুকিতে থাকবেন। বুধবার ওল্ডহ্যামে প্রকাশিত নতুন একটি সমীক্ষা রিপোর্টে এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞানীরা এর আগে মানুষের নাকের ভেতর থেকে এক ধরণের অ্যান্টিবায়োটিকের সন্ধান পেয়েছেন। নাকের ভেতরে থাকা মাইক্রোবস যে যৌগ তৈরি করে তা বেশ কিছু ভয়ঙ্কর প্যাথোজেন হত্যা করতে পারে। এসব প্যাথোজেনের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সুপারবাগ এমআরএসএ। এতে যারা আক্রান্ত হবেন তাদের শরীরে মাকড়সার কামড়ের মতো চিহ্ন দেখা যাবে।

বুধবার প্রকাশিত নতুন ওই সমীক্ষা রিপোর্ট বাংলাদেশিসহ সকল বেম সদস্যদের জন্যই নতুন উদ্বেগ বয়ে এনেছে। বেম মানে ‘ব্ল্যাক, এশিয়ান, মাইনোরিটি এথনিক’। বাংলাদেশিরাও ‘বেম কমিউনিটির’’সদস্য হিসেবে পরিচিত। তারা সংখ্যায় প্রায় ৫ লাখ। এই সমীক্ষা প্রথমবারের মতো বলেছে, করোনায় শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে বেম সদস্যদের মারা যাওয়ার হার বেশি। লন্ডনের অন্যতম বাংলাদেশি অধ্যুষিত ওল্ডহ্যাম এবং আরো দুটো মেট্রোপলিটন বরোতে পরিচালিত এক সমীক্ষা সতর্ক করে দিয়েছে, শ্বেতাঙ্গ মানুষের চেয়ে লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকেরা করোনায় সামনের দিনগুলোতে বেশি মারা যেতে পারেন। এমনকি তারা সুপারবাগ এম আর এসএ-তে সংক্রমিত হবেন।

লন্ডনের চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন আপনার যদি শরীরে মাকড়সার কামড়ের মতো চিহ্ন দেখা যায় তাহলে অনতিবিলম্বে জরুরী স্বাস্থ্য বিভাগে ফোন করুন। আপনার চিকিৎসক বিষয়টি বোঝার জন্য একটা কালচার টেস্ট দেবেন। তবে বলা হয়েছে সব ধরনের ইনফেকশন এমআরএসএ নয়।

হেলথ চ্যারিটি অ্যান্টিবায়োটিক রিসার্চ ইউকে (আরুক) এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে এবং এই প্রতিবেদনের সঙ্গে বিখ্যাত ব্রিটিশ বাংলাদেশি বা পর্বতারোহী আক্কি রহমানের ছবি রয়েছে। তার একটি আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে। ৭ অক্টোবর ওল্ডহ্যাম ইভিনিং ক্রনিকলে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরুক এটা উদঘাটন করেছে যে, বেম কমিটির সদস্যরাই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণের শিকার হওয়ার বেশি ঝুকিতে থাকবেন। আরুক সম্প্রতি এটা খতিয়ে দেখার জন্য এশীয় কমিউনিটি অধ্যুষিত ওল্ডহ্যাম, বোল্টন এবং রচডেলের ওপর একটি স্ন্যাপশট সার্ভে পরিচালনা করে।

প্রবাসী বাংলাদেশি সহ ৩শ জনের উপর পরিচালিত এই সমীক্ষায় তারা বিশেষ করে নজর রেখেছে যে কি করে এই বেম সদস্যরা দৈহিক অনুশীলন এবং পুষ্টি বিষয়ক খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে উদাসীনতা অবলম্বন করে থাকে।

অ্যান্টিবায়োটিক রিসার্চ ইউকের চিফ এক্সিকিউটিভ প্রফেসর কলিন হার্নার বলেছেন, আমাদের মধ্যে অনেকেই সচেতন রয়েছেন যে কোভিড-১৯ থেকে বেম সদস্যদের মধ্যে মৃত্যুর হার অপেক্ষাকৃত কেন বেশি, এই বিষয়ে অত্যন্ত ক্ষতিকর গুজব রয়েছে। এটা কেন ঘটছে?

এখন আমরা আমাদের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলতে পারি, এটা কোন জেনেটিক কারণ ঘটিত বিষয় নয়। বরং স্বাস্থ্যগত বৈষম্যের কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ইনফেকশন থেকে বছরে দশ লাখ করে লোক মারা যাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এখন করোনাকালে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ইনফেকশন অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। তাই এই ইনফেকশন যাতে আরেকটি মহামারীতে পরিণত না হয়, সেজন্য আমাদেরকে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সে কারণেই আমরা এদিকে নজর দিতে চাই। আমাদের সমাজে এখনো পর্যন্ত বৈষম্য নানাভাবে বিদ্যমান রয়েছে। আরেক সমীক্ষায় আরও একটি বিষয়ের দিকে নজর দেয়া হয়েছে, সেটা হল দক্ষিণ এশীয় কমিউনটির সদস্যরা কি ভাষায় স্বাস্থ্যবার্তা পেতে চান? সে বিষয়ে দেখা গেছে, তারা সাধারণত টেলিভিশনের খবর, বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিষয়ক সতর্কতা বা পরামর্শ জানতে আগ্রহী।

ওই সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে যে, কর্তৃপক্ষসমূহ এটা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে সুস্বাস্থ্যের বিষয়ে তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব। এরকম একজন রোল মডেল হচ্ছে আক্কি রহমান। তিনি লন্ডনে বাঙালি মাউন্টেনার হিসেবে সুপরিচিত।

আক্কি রহমান সবেমাত্র কিলিমাঞ্জারো এবং মন্ট ব্লঙ্ক পর্বত জয় করেছেন। তিনি বলেছেন, আমার সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষের মতো আমার এটা জানা নাই কিংবা আমি বুঝতে অক্ষম অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী রোগ এমআরএসএ কি রোগ? কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের কমিউনিটিকে যদি আরেকটি অ্যান্টিবায়োটিক মহামারী করোনার মতোই অপেক্ষাকৃত বেশি আঘাত করে, তাহলে সেটা খুবই উদ্বেগজনক খবর। আমাদের এখানকার সংগঠনগুলোর উচিত হবে যথাসময়ে অনতিবিলম্বে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবার্তা এবং স্বাস্থ্য সেবা এই বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পৌঁছে দেওয়া। এবং তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। বিষয়টিকে কতগুলো লিফলেট তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং তা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমিত থাকা উচিত নয়। কমিউনিটি সদস্যরা শুধু নিজেরাই ভালো থাকবে না ,অন্যদেরকেও কিভাবে সুরক্ষা দিতে পারে সে বিষয়েও তারা তাদের ভূমিকা রাখবে। আমি অ্যান্টিবায়োটিক রিসার্চ ইউকে আরুকের মত সংগঠনকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসার জন্য অভিনন্দন জানাই।

উল্লেখ্য যে অ্যান্টিবায়োটিক রিসার্চ ইউকের পেশেন্ট সাপোর্ট সার্ভিস করোনা মহামারীকালে বেড়ে উঠেছে অনলাইনের মাধ্যমেই।