জঙ্গি হামলায় নিহত পুলিশ সদস্যদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি

শরিফুল হাসান শিশির

হোলি আর্টিজান হামলা: ২০১৬ সালের সেই রাতে কী ঘটেছিল
২০১৬ সালের ১ জুলাই দিনটি ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যারাতে হঠাৎ করে খবর আসে গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। রাত ৯টা ৫ মিনিট: গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের হামলার খবর পায় পুলিশ। গুলশানের পুলিশের অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার আশরাফুল করিম জানান, খবর পাওয়ার সাথে সাথে গুলশান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক এ’সময় টুইট করেন ‘পুলিশ ইজ সারাউন্ডিং দ্য এরিয়া, গানফায়ার স্টিল অন’। রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোলাগুলিতে আহত হন বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র‌্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের কয়েকশো সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়।

মো. রবিউল করিম
গুলশানের জঙ্গি হামলায় অভিযানকালে নিহত হয়েছিলেন আরেক পুলিশ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (এসি) মোঃ রবিউল করিম (৩৮)। তিনি ছিলেন ডিবির সহকারী কমিশনার । এসি রবিউলের ডানপাশের বুকে স্প্লিন্টারের আঘাত লেগেছে। তাতেই ফুসফুস ছিদ্র হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।২ জুলাই রাত ১২:২০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন রবিউলের শরীরে স্প্লিন্টারের অসংখ্য আঘাত ছিল। তার বাড়ি ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার শান্ত কাটিগ্রামে। তার বাবার নাম মৃত আব্দুল মালেক ,মাতা করিমন নেসা (৫৫)। তিনি ছিলেন বিসিএস পুলিশের ৩০তম ব্যাচের সদস্য। মৃত্যুর পর তার একটি কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করে। এছাড়া তার ৮ বছর বয়সের এক ছেলে রয়েছে।

ওসি সালাহউদ্দিন খান
গুলশানের জঙ্গি হামলায় অভিযানকালে নিহত হন বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান (৫০)। ওসি সালাহউদ্দিনের গলার ডানপাশে স্প্লিন্টারের আঘাত লেগেছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ জুলাই রাত ১১টা ২০ মিনিটে ইন্তেকাল করেন তিনি। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলা শহরের ২৭৮নং ব্যাংকপাড়ায়। ১৯৬৭ সালে গোপালগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ওসি সালাহউদ্দিন তার বাবার নাম মৃত আব্দুল মান্নান খান মাতা মৃত লুতফান্নেসা। ১১ ভাই বোনের মধ্যে ওসি সালাহউদ্দিন খান ছিলেন ষষ্ঠ। তিনি ১৯৯০ সালে সাব-ইন্সপেক্টর পদে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে তার কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরি জীবনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুনামের সঙ্গে কাজ করায় পেয়েছেন জাতিসংঘ শান্তি পুরস্কার। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী রোমকিম এবং এক মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ছিল তার সংসার।

শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের চেকপোস্টে ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের দিন সকাল পৌনে ৯টার দিকে পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশির মুখে পড়ে চাপাতি, বোমা ও পিস্তল নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এসময় হামলায় চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যসহ ১৪ পুলিশ সদস্য আহত হন। তাদের মধ্যে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে কনস্টেবল জহিরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। এছাড়াও কনস্টেবল আনসারুল হককে ময়মনসিংহ সিএমএইচে নেওয়ার পর ওই দিনই দুপুরে তার মৃত্যু হয়।

কনস্টবল আনছারুল হক
১৯৮৭ সালে নেত্রকোনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন ।বাবাঃ মৃত মোঃ সিদ্দিকুর রহমান, মাঃ মোছাঃ রাবেয়া আক্তার (৬৫)।২০০৬ সালে কনস্টবল পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন।সর্বশেষ তিনি কিশোরগঞ্জ জেলায় কর্মরত ছিলেন।তিনি বিবাহিত ছিলেন।৭ জুলাই, ২০১৬ ইং কিশোরগঞ্জ জেলার শোলাকিয়ায় কর্তব্যরত অবস্থায় জঙ্গী হামলায় নিহত হন ।

কনস্টবল জহিরুল ইসলাম
১৯৯২ সালে ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবাঃ মৃত আব্দুল মজিদ, মাতা জুবেদা খাতুন (৬৫)। ২০১১ সালে কনস্টবল পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি কিশোরগঞ্জ জেলায় কর্মরত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন।৭ জুলাই, ২০১৬ ইং কিশোরগঞ্জ জেলার শোলাকিয়ায় কর্তব্যরত অবস্থায় জঙ্গী হামলায় নিহত হন।

আতিয়া মহলে অভিযান
২৪ মার্চ রাত দেড়টার দিকে পুলিশ সদস্যরা সিলেটের শিববাড়ির পাঠানপাড়া সড়কের পাশের আতিয়া মহলটি ঘিরে ফেলে। রাত সাড়ে ৪টার দিকে তারা নিশ্চিত হন আতিয়া মহলের নিচতলায় জঙ্গিরা অবস্থান করছে। পুলিশ সদস্যরা তখন আতিয়া মহলের নিচতলার ছয়টি কক্ষ বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয় এবং ভবনের মূল প্রবেশ পথের কলাপসিবল গেইটে তালা লাগিয়ে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এসময় পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গিরা তাদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে। ২৫ মার্চ ২০১৭ সালে আতিয়া মহল থেকে ২০০ গজ দূরে আতিয়া মহলের বাইরের জঙ্গীদের বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জন। এছাড়া আহত হন র্যােবের গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদসহ ৪৪ জন।

পুলিশ পরিদর্শক চৌধুরী মো. আবু কয়ছর
মো. আবু কয়ছর বিপিএম ১৯৬৬ সালে সুনামগঞ্জ জেলার সদরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৃত মো. আসাদুর আলী চৌধুরী ও মাতা মোছা. হাসনা চৌধুরী।তিনি ১৯৯১ সালে উপ-পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। ২৫ মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যা অনুমান ১৯.০০ ঘটিকায় সিলেট মহানগরীর মোগলা বাজার থানাধীন শিববাড়ীস্থ পাঠানপাড়ার আতিয়া ভিলার অদূরে সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ রোডের ওপর বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দ হয়। উক্ত বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বোম্ব ডিসপোজাল টিমের ইনচার্জ হিসেবে মরহুম চৌধুরী মো. আবু কয়ছর সঙ্গীয় অন্য সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গমন করেন। তাঁর জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ঘটনাস্থলের আশপাশে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। রাস্তার পাশে জঙ্গিদের ফেলে যাওয়া হলুদ রঙের শপিং ব্যাগে কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য আছে কি না তা পরীক্ষা করার মুহুর্তে বোমা বিস্ফোরিত হলে চৌধুরী মো. আবু কয়ছর সঙ্গীয় অন্য দুজন পুলিশ সদস্যসহ বোমার আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। তাঁদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক চৌধুরী মো. আবু কয়ছরকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম ১৯৭৭ সালে নোয়াখালী জেলার সদরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো. নুরুল ইসলাম ও মাতা মোছা. ফিরোজা বেগম।তিনি ২০০৪ সালে উপ-পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। ২৫ মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যা অনুমান ৬টায় সিলেট মোগলাবাজার থানাধীন শিববাড়ীস্থ পাঠানপাড়ার আতিয়া ভিলার অদূরে সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ রোডের ওপর বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দ হয়। উক্ত বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বোম্ব ডিসপোজাল টিমের অন্য সদস্যদের সাথে পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গমন করেন। তাঁর জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ঘটনাস্থলের আশপাশে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। রাস্তার পাশে জঙ্গিদের ফেলে যাওয়া হলুদ রঙের শপিং ব্যাগে কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য আছে কি না তা পরীক্ষা করার মুহুর্তে বোমা বিস্ফোরিত হলে মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম সঙ্গীয় অন্য দু’জন পুলিশ সদস্যসহ বোমার আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। তাঁদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অসীম সাহসী এ বীর সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত ২০১৭ সালের ২৬ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।