আর কবে শিখবো হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার?

মাস্ক, সাবান আর স্যানিটাইজার— এই তিন অস্ত্রেই যেন সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে মহামারী কোভিড-১৯ কে ঘায়েল করার। এর সাথে বলা হচ্ছে শারীরিক দূরত্ব আর হাঁচি-কাশি শিষ্টাচারের কথা। অনেকেই বলছেন সবচেয়ে বেশি দরকার লাইফ স্টাইল বা জীবনাচরণ পরিবর্তনের। বিভিন্ন সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই কয়েকদিন থেকে চিন্তা করছিলাম হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার নিয়ে কিছু কথা শেয়ার করার।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব অর্থাৎ আশরাফুল মাখলুকাত। মহান আল্লাহ প্রদত্ত মেধা, মানবিকতা, সৃষ্টিশীলতা মানুষকে এই পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীদের থেকে উন্নত ও পৃথক করেছে। মানুষের কিছু পরিশীলিত আচরণ যা আমরা প্রতিনিয়ত পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিখি— সভ্য সমাজে চলার জন্য যে আচরণগুলি খুবই প্রয়োজনীয় এবং সামাজিক জীবনযাপনকে সহনীয়, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে তুলতে ভূমিকা রাখে— সেই আচরণ সমষ্টিকেই বলা হয় শিষ্টাচার। করোনাকাল আমাদের সমাজ জীবনে মানুষের আচরণে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো নতুন করে চোখের সামনে নিয়ে এসেছে। এই মহামারীর সময়ে কিভাবে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে জীবাণু ছড়ায় সে বিষয়ে অনেক আলোচনা চারদিকে হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিং ও স্বাস্থ্যবিধি প্রচারণায় বারবার বলা হচ্ছে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করতে হয় একুশ শতকে যখন শিক্ষা, সভ্যতা ও প্রযুক্তির সুবিধা ঘরে ঘরে সে সময়েও কেন মৃত্যুর এই ভয়াল থাবার মুখোমুখি হয়ে আমাদের শিখতে হচ্ছে— ‘হাঁচি- কাশির শিষ্টাচার’?

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, যথাযথ সামাজিকীকরণের অভাব। এই সমাজে না পরিবারে, না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে— কোথাও কখনই এই সামাজিক আচরণের কথা গুরুত্ব দিয়ে বলা হয় না। চর্চা করা হয় না। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় সামাজিক শিষ্টাচার এর উপর দায়সারাভাবে অধ্যায় নামেমাত্র থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানে খুব গুরুত্ব দিয়ে এই শিষ্টাচার প্রসঙ্গে ক্লাস নেয়া হয় কিনা সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। শহর কিংবা গ্রামীণ জনপদে শিশুর মনোজাগতিক আচরণগত পরিবর্তনের কাল অর্থাৎ বেড়ে উঠার প্রাথমিক পর্যায়ে এই সব বিষয়ে শিক্ষাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই, যেখানে জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোতে প্রাইমারি স্কুলের পাঠ্যক্রমে শিষ্টাচার শিক্ষা শুধু অন্তর্ভূক্ত না খুবই গুরুত্ব দিয়ে শেখানো হয়। চর্চা করানো হয়। এ নিয়ে কোনো হেলাফেলা করা হয় না। এজন্য জাপানীদের নিয়মানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও কর্মদক্ষতার সুনাম বিশ্বব্যাপী।

কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা শেয়ার করা যায়। বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদানের পর প্রথম পোস্টিং ছিল সিলেট গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। একদিন সকালবেলা হাসপাতালের ইনডোর বিল্ডিং থেকে আউটডোর বিল্ডিং এ যাওয়ার পথে হঠাৎ দেখি এক ভদ্রলোক মুখ ভর্তি পানের পিক সশব্দে সিঁড়িতে ফেলে দিলেন। নতুন চাকুরী। ব্যাপারটা দেখেই বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কি পানের পিক ফেলার জায়গা’? এ কথা শুনে উল্টো উনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন যেন উনি নয়, এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে ভুলটা আমিই করলাম। পাশ থেকে আরেকজন ভদ্রলোক বলে উঠলেন , “স্যার, বাদ দেন। গ্রাম গঞ্জের মানুষ বুঝে নাই।” প্রান্তিক মানুষ বলেই সামাজিক সভ্যতা থাকবে না, এটাই যেন আমরা ধরে নিয়েছি। পরিবর্তন-প্রচেষ্টায় মানুষ খুব বেশি উৎসাহী না। চিন্তার এই বৃত্ত থেকে কবে আমরা বেরিয়ে আসব কে জানে। সোশ্যাল বিহেভিয়ারিয়্যাল চেঞ্জের জন্য লোকাল স্টেক হোল্ডারদের যুক্ত করা জরুরি। যেমন গ্রাম এলাকায় মসজিদের ইমাম সাহেবরা মহামারীর এই সময়ে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার নিয়ে আলোচনা করে জনসচেতনতা তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করা যায়। এ দেশের গ্রামীণ জনপদের প্রায় সবাই তো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ নেন, তাই সেখান থেকেই সামাজিক শিষ্টাচার গুরুত্ব দিয়ে শেখানো উচিত। আমরা যারা বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালে কাজ করি তারা জানি, যত্রতত্র এই কফ-থুতু-পানের পিক ফেলা আমাদের হাসপাতালগুলোর হাইজিন ম্যানেজমেন্টে জন্য কত বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যত্রতত্র কফ থুতু ফেলার জন্য খুব কম ক্ষেত্রেই কাউকে দুঃখিত হতে দেখি। বরং লোকজন উদাসীন, নির্বিকার। এটা কেবল একটিমাত্র উদাহরণ।

এখন চারদিকে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের আতংক এবং ভয় সবার মধ্যে। এখন বলা হচ্ছে তাৎক্ষণিক টিস্যু না থাকলে বা আচমকা হাঁচি-কাশি আসলে, নিজের কনুইয়ের কাছে মুখ নিয়ে হাঁচি কাশি দিতে যেন ড্রপলেট ছড়িয়ে না যায়। কিন্তু কোন কথাই যেন সাধারণ জনগোষ্ঠীর কানে যাচ্ছে না। মাস্ক পরিধান না করাসহ শিষ্টাচার না মেনে প্রকাশ্যে হাঁচি-কাশির মত আমাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ পুরো সমাজকে সর্বক্ষণই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। মহামারী নিয়ন্ত্রণে না এসে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

হাঁচি-কাশির সাথে একজন ব্যক্তির মুখ দিয়ে সবেগে বেরিয়ে আসে অগণিত পানির বিন্দু মিশ্রিত বাতাস(ড্রপলেট)— সে বাতাস কিন্তু নিঃসৃত হয় ফুসফুস থেকে। আর করোনা ভাইরাস বাসা বাঁধে শরীরের সেই ফুসফুস বা শ্বাসতন্ত্রেই। তাই মারাত্মক ছোঁয়াচে করোনা মহামারী প্রতিরোধে বিনয়ের সাথে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার এর মাধ্যমে কিভাবে ব্যক্তিগত জীবনে চর্চা করতে পারি এবং অন্যদেরও সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে পারি :

১) হাঁচি ও কাশির দেয়ার সময় ভালো করে নাক ও মুখ ঢাকতে ব্যক্তিগত রুমাল অথবা টিস্যু ব্যবহার করবেন। ব্যবহৃত টিস্যু যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট ময়লা ফেলার ঝুড়ি/ডাস্টবিনে ফেলুন।

২)মাস্ক ব্যবহার করা ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাবে না। বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই সঙ্গে যেন টিস্যু বা পকেট রুমাল সাথে থাকে। ব্যবহৃত রুমাল অবশ্যই প্রতিদিন সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

৩) হাতের কাছে টিস্যু বা রুমাল না থাকলে হাতের কনুই ভাজ করে নাক-মুখ ভাজের কাছে এনে বাহুতে হাঁচি-কাশি দিবেন। যেকোন হাঁচি-কাশির পরে অবশ্যই সু্যোগ করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে ভুলবেন না। নাক-মুখ-চোখে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকবেন।

৪)এই সময়ে হাঁচি-কাশির সমস্যা থাকলে দয়াকরে জনসমাগম/পাবলিক প্লেসে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৫)যেখানে সেখানে কফ/থুতু/পানের পিক ফেলার বদ অভ্যাস পরিহার করুন।

মনে রাখবেন এখন কেউ আর নিরাপদ নয়! সত্যিকার অর্থে কেউই ভাবেননি যে এই মহামারীর প্রভাব এত ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছে। আমরা এক কঠিন সময়ের মধ্যে আছি। ২০২০ সাল করোনার সংক্রমণে ক্রমান্বয়ে অভিশপ্ত হয়ে উঠছে! তাই করোনা মহামারীর সংক্রমণ থেকে বাচতে প্রদত্ত স্বাস্থ্যবিধি সর্বদা মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই এবং এই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অন্যকেও উৎসাহিত করতে হবে।

সবশেষে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, “হে মহান আল্লাহ আর তুমি নিওনা আমাদের পরীক্ষা; এবার প্রভু তুমি মোদের রক্ষা কর দান করে শিষ্টাচার আর হেদায়েতের দীক্ষা।”

লেখক:
ডা: মো: আব্দুল হাফিজ শাফী,
বি.সি.এস(স্বাস্থ্য),
নাক-কান-গলা বিভাগ;
বি.এস.এম.এম.ইউ(প্রেষণে),ঢাকা।