আজকের দিনটা শুধুমাত্র বাবাদের জন্য

ডাঃ আব্দুল হাফিজ শাফীঃ

বাবাকে নিয়ে আমাদের অনুভূতিগুলো সবসময়ই মনের গহীনে চাপা পড়ে থাকে। আমি কখনই তেমন ভালো লিখতে পারি না। কিন্তু বিশ্বাস করি বাবার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে অনুভূতি প্রকাশের জন্য লেখক সত্ত্বার প্রয়োজন নেই; মনের ভালোবাসাটাই যথেষ্ট।

বাবাদের প্রতি সন্তানদের ভালোবাসার চিরন্তন প্রকাশ সবসময়ই ঘটে থাকে আড়ালে-আবঢালে, নিরবে-অপ্রকাশিতভাবে। তারপরও আমরা এই পৃথিবীর বাসিন্দারা বছরের একটা দিনকে বাবার জন্য রেখে দিয়েছি বিশেষভাবে।

আজ সেই দিন, জুন মাসের ৩য় রোববার। আজ ২১ জুন, বিশ্ব বাবা দিবস। আজ বাবাকে মুখ ফুটে ভালোবাসি বলার দিন, যদিও লজ্জায় বলতে পারবোনা আজকেও! তবে অনেকে আবার সমালোচনা করবেন যে, বাবাকে স্মরণ করার জন্য শুধু একটি দিন কেন? অনেকে বলবেন এটা আমাদের সমাজের জন্য নয়। তাদেরকে বিনয়ের সাথে শুধু একটি কথাই বলবো, বিশেষ একটি দিনের কারণে একটু বেশী মাতামাতি অথবা আহ্লাদী প্রকাশ করলেতো কোন দোষ নেই। হাসিমুখে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করা প্রিয় বাবাদের একদিন আলাদাভাবেতো স্মরণ করাই যায়। কি বলেন? মনে রাখবেন পিতার বুকফাটা আর্তনাদ কিংবা বৃদ্ধ বয়সের কষ্ট না শোনার মতো কিছু সন্তানও আছে কিন্তু এদেশে।

বাবা শুধু একটি সম্পর্কের নাম নয়, বাবার শব্দটার সাথে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী অনুভূতি। যখন বাবা কথাটি উচ্চারণ করি আমি নিশ্চিত তখন সঙ্গে সঙ্গে যেকোন বয়সী সন্তানের হৃদয়ে অবচেতন মনেই শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনুভূতি এমনিতেই জেগে উঠে। বাবারা আমার মতো সকল সন্তানের পথ প্রদর্শক।

এই বিষয়ে একটা গল্প বলি; আমি তখন কেবল মাত্র জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছি। একদিন আমাদের তৎকালীন শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ মহোদয় লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ আলী আহমেদ স্যার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে মনোমুগ্ধকর মোটিভেশনাল ক্লাস নিলেন। স্যারের উপস্থাপনায় মুগ্ধ হয়ে আমি তখন ভাবলাম এপ্লাইড ফিজিক্স এ পড়াশোনা করলে কেমন হয়। ওইদিন স্যারের রুমে সাবজেক্ট চয়েজে তাই জীব বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে দিলাম। বাসায় এসে বিষয়টা আব্বাকে বললাম। লক্ষ করলাম আব্বার মুখটা একটু বিষণ্ণ হয়ে গেলো, আব্বা শুধু উনার অভিজ্ঞতা থেকে আমাকে বললেন ভবিষ্যৎ এর জন্য সকল পথ খোলা রাখা উচিত। পরদিনই অতিরিক্ত বিষয়ের জায়গায় অন্যটা বাদ দিয়ে জীব বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করলাম।

পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমার বাবা আমাকে সবসময়ই স্বাধীনতা দিয়েছেন, চাপিয়ে দেননি কিছু কখনো। কিন্তু গল্পটা শেয়ার করলাম কারণ আজকে আমার চিকিৎসক হওয়ার পিছনে ওই দিনের পথপ্রদর্শনটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদি আমি পরামর্শ না নিতাম, তাহলে পরবর্তীতে চিকিৎসা পেশার প্রতি আমার ব্যাকুলতা বা নিজের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারি পড়া হতোনা। তাই আমার মনে হয়, বাবারা এই পৃথিবীতে সূর্যের আলোর মত আলো দিয়ে আমাদেরকে ঘিরে রেখেছেন।

মানুষের কত রঙ্গিন স্মৃতি থাকে, শৈশব থাকে নানারকম বৈচিত্র্যতায় ভরপুর। এই শহরের কোটি মানুষের গল্প কোটিরকম৷ তারপরেও সবার জীবনেই বাবাকে নিয়ে নানা ধরণের গল্প থাকে। সেই রকমই একটি চিকেন বিরিয়ানির গল্প।

ছোটবেলা থেকেই আমার চিকেন বিরিয়ানি খুব প্রিয়। প্রাইমারিতে ক্লাস ফাইভে আম্বরখানা দরগাগেইট স্কুলে পড়ার সময় ভাগ্যগুণে যদি হঠাৎ কদাচিত কখনো বাবা স্কুল থেকে নিয়ে আসতেন, তখন আবদার করে বসতাম। বাবা হাসিমুখে ছেলের শখ পূরণ করতেন। পৃথিবীতে আমার বাবাই আমার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল। আবেগে ভরপুর আর বাবার মায়াভরা ভালোবাসা পেয়ে এসেছি সদা। কিন্তু নিজে তখন খেতেন না, পাশে বসে আমার খাওয়া দেখতেন (বাবারা এমনই হয়)! তখনকার দিনে হাফ ডিমসহ চিকেন বিরিয়ানির দাম ছিল ৩৫ টাকা! সেই মজাদার স্বাদ এখন ১২০ টাকার ফুল ডিমের বিরিয়ানিতেও পাই না।

এই গল্প শেয়ার করার আরেকটি কারণ আছে! এখন আমিও বাবা হয়েছি, আমারও ছেলে আছে। জোহানকে যখন জন্মের পরপরই রাত ২ টায় প্রথম স্পর্শ করেছিলাম তখন যে আবেগ আমাকে ঘিরে ধরেছিল তা উপলদ্ধি করার কোন সীমারেখা নেই। আমার ছোট জোহানেরও খুব পছন্দ ফ্রাইড রাইছ। একবার এক অনুষ্ঠানে এক প্যাকেট ফ্রাইড রাইছসহ লাঞ্চ দেয়া হয়েছিল। তখনই বাচ্চাটার ফ্রাইড রাইছ প্রীতির কথা মনে পড়ে যায়। বাসায় নিয়ে হাতে দিলে যে হাসিটা দেখেছিলাম জোহানের মুখে তখন আমার ছোটবেলার সেই বিরিয়ানি খাবার সময় নিজে না খেয়ে আমার বাবার তাকিয়ে থাকার কথা স্মরণ হয়েছিলো। আসলে বাবার ভিতরটা আল্লাহ তায়ালা এমনভাবেই তৈরী করে দিয়েছেন। আমার নিষ্পাপ জোহানের জন্য প্রশস্ত থাকুক সবার প্রার্থনার দরজা।

বাবাদের আমরা আব্বু/আব্বা/বাবা/পাপা/ডেডি যে নামেই ডাকিনা কেন! সব পিতাই তার সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করেন, এটা ধ্রুব সত্য। বাবাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা-স্নেহ অপ্রকাশিতই থেকে যায়। আমার আব্বাকে চিরকালই সাধারণ জীবন-যাপন করতে দেখে আসছি। যদিও প্রত্যেকের বাবাই সন্তানের কাছে নায়ক। সেরকমই একটি গল্প মনে হল লিখতে গিয়ে।

আমি তখন স্যার সালিমুল্লাহ মেডিকেলে প্রথম বর্ষে। প্রথম কার্ড পরীক্ষার পূর্বে ডেংগু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলাম। খবর পেয়েই আব্বা সিলেট থেকে চলে গিয়েছিলেন। এটা বলার মতো ব্যাপার না। পরের দিন দুপুরের দিকে আমাকে দেখতে আসা এক বড় ভাইকে বাবা বললেন যে উনার মাথা ঘোরাচ্ছে। ভাইয়া আব্বাকে জিজ্ঞাসা করলেন মনে হয় আংকেলের ক্ষুধা লাগছে। তখনই আব্বা বলে উঠলেন উনি সকাল থেকে কিছুই খান নি এমনকি পানি খেতেও ভুলে গেছেন। অসুস্থ ছেলের জন্য নতুন জায়গায় এসে আমার চাহিদামত খাবারের ব্যবস্থা এবং সন্তানের সেবা করতে গিয়ে টেনশনে নিজের খাবারের কথাই ভুলে গেছেন আব্বা। জ্বি, বাবারা এমনই হয়, পরম নির্ভরতার প্রতীক। তাদের বাহ্যিক রুপ ভিন্ন হলেও, অন্তঃস্থ রূপ একই চিহ্ন বহন করে সন্তানদের জন্য। এই যে বাবাদের দিন-রাত পরিশ্রম খাটুনি, এর সামান্যও নিজের জন্য নয়। এসব কিছু জীবনের সকল উত্তাপ থেকে পরিবারের সবাইকে বটগাছের ছায়ার মতো আগলে রাখার চেষ্টা।

আজকের দিনে মনে পড়ছে আমার আরেক বাবাকে অর্থাৎ শশুর আব্বা। যদিও খুব অল্প সময় পেয়েছিলাম সত্য আর ন্যায়ের প্রতি অবিচল ব্যক্তিত্বকে। আমাকে উনি স্বপ্ন দেখাতেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার। মহান রাব্বুল আলামীন যেনো জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন আমার শশুরকে সেই দোয়াই করি।

বাবা দিবসে দোয়া করি আমার আব্বাসহ পৃথিবীর সকল বাবাদের মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্থ্য রাখুন এবং নেক হায়াত দান করুন। সেজন্য নামাজ আদায়ের শেষে আমরা মুসলমানরা এই দোয়াটি যেনো করতে ভুলে না যাই, ‘রাব্বীর হাম হুমা কামা রাব্বাইয়ানী সাগীরা’। আর আমরা যেনো আমাদের বাবাদের সারাটি জীবন ধরে দিয়ে যাওয়া ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারি, মহান সৃষ্টিকর্তা যেনো সেই তৌফিক দান করেন।