অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদ কোম্পানীগঞ্জের ‘শিলাকুড়ি’

স্টাফ রিপোর্ট :: কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার তেলিখাল ইউনিয়নের শতবর্ষ প্রাচীন গ্রাম ‘শিলাকুড়ি’। একদিকে নদী আর তিন দিকে হাওরবেষ্টিত এ জনপদ বর্ষাকালে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। কয়েকশ পরিবারের দেড় সহস্রাধিক মানুষের এ জনপদে জন্ম নেয়াই যেন মানুষগুলোর ‘আজন্ম পাপ’। যোগাযোগের বন্ধ্যাত্ব আর সভ্যতার ছোঁয়াবঞ্চিত শিলাকুড়ির মানুষগুলো পুরুষানুক্রমেই জলদাস। এরা চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক যন্ত্রণা সহ্য করে যাপিত জীবন পার করছে অনেকটা পরগাছার মতো। নির্বাসিত মানুষগুলোও যেখানে নাগরিক অধিকারের সংশ্রব থেকে বঞ্চিত হয় না, সেখানে শিলাকুড়ি গ্রামবাসীর অধিকারের সকল পথ রুদ্ধ। শুষ্ক মওসুমে নিকটবর্তী জনপদে আসতে ঘণ্টাকাল বন্ধুর পথে হাটতে হয়, আর বর্ষায় হাওড়ের দৈত্যাকৃতির ঢেউ-আফালের সাথে লড়াই করে বজরা-ডিঙি বেয়ে চলতে হয় তাদের। যে কিশোরটি ভোর হলেই ডিঙি নিয়ে হাওর গমন করে দুটো চুনোপুঁটি আর বাইল্লা মাছের খোঁজে, সে কিশোর জন্মের পর তার পিতাকে কিংবা তার পিতা তার পিতামহকে দেখেছে হাওড়ের ঢেউয়ে লড়তে পরিজনদের ক্ষুন্নিবৃত্তি মেটানোর নান্দনিক সংগ্রাম করতে। জীবন তার পাওনা পরিশোধে করতে এখানে ব্যর্থ। অক্ষমতার নীল বিষে মৃতপ্রায় এ জনপদের মানুষের জীবন।

দিনবদলের স্রোতে সবাই যখন এগিয়ে চলছে সেখানে থমকে আছে শিলাকুড়ি। শিক্ষার আলো না পৌঁছায় দিনবদলের স্বপ্ন দেখাটাও একটা স্বপ্ন। একটা পাঠশালাও এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি এ গ্রামে। শিক্ষা এবং সভ্যতার যুগপৎ সংকট আর কুসংস্কার-অসংলগ্নতার ঘেরাটোপে আটকেপড়া মানুষগুলোকে সেবাদাস আর ভাগ্যের পরিহাসের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে নিয়তি। অথচ একটা স্কুল কিংবা শিক্ষালয় থাকলে এ গ্রামের মানুষের জীবন মান হয়তো বদলে যেতো।

শিলাকুড়ি গ্রাম থেকে নিকটবর্তী লামনীগাও, বুড়িডহর, চাটিবহর কিংবা কোম্পানীগঞ্জ গ্রামের দূরত্ব অনেক। সবচেয়ে কাছের স্কুলটিও তিন কিলোমিটার দুরে। সাহস করে অনেকে সন্তানদের এসব গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করালেও এরা যাতায়াতের ধকলে ঝরে পড়ে। তাইতো দূরবীন দিয়ে খোঁজেও এ গ্রামে পাওয়া যায়নি উচ্চ শিক্ষিত লোক। অশিক্ষা, অসংলগ্নতায় বেড়ে ওঠা মানুষগুলো নিদারুণ অজ্ঞতার অভিশাপে জর্জরিত হয়ে দিন কাটাচ্ছে অস্পৃশ্য মানুষের মতো।

এ ব্যাপারে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. জহিরুল হক জানান, আমরা উপজেলার মাসিক মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করেছি। কিন্তু কোনো উদ্যোক্তা না পাওয়ায় নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভাব হচ্ছে না। ৪ অক্টোবর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় কয়েকটি নতুন বিদ্যালয়ের প্রস্তাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাঠিয়েছি। সেখানে শিলাকুড়ি গ্রামের নাম নেই। শিলাকুড়ি গ্রামে কোনো উদ্যোক্তা পাওয়া গেলে আগামীতে প্রস্তাবনা পাঠাবো।

একই কথা জানালেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন আচার্য। তিনি একাত্তরের কথাকে বলেন, অতিসম্প্রতি আমরা নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য একটি তালিকা পাঠিয়েছি। যেসব গ্রামে স্কুল স্থাপনের মতো জায়গা পাওয়া গেছে বা স্থানীয়রা দীর্ঘদিন থেকে স্কুল নির্মাণের দাবি জানাচ্ছেন, সেসব গ্রামের নাম ওই তালিকায় আছে। স্কুলের ভবন নির্মাণের মতো জমি পেলে আমরা অবশ্যই প্রস্তাবনা পাঠাবো।

এএসআর/০০৭